July 31, 2026, 8:07 am

এখানে রোগীর আর্তনাদ কেউ শোনে না

এখানে রোগীর আর্তনাদ কেউ শোনে না

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডের মেঝেতে একজন শুয়ে আছেন। হাত, পা, বুক ব্যান্ডেজ মোড়ানো, ছটফট করছিলেন তিনি। দুই-তিন জন স্বজন তাকে ঘিরে আছে। পাশেই গড়াগড়ি খেয়ে কাঁদছিলেন এক নারী। কান্না ছড়িয়ে পড়ছে ওয়ার্ডে থাকা অন্য রোগী ও স্বজনদের মধ্যে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে এমন দৃশ্য দেখা যায়। ছটফট করা রোগীর নাম মো. আরমান। আর বিলাপ করা ওই নারী আরমানের স্ত্রী সুইটি আক্তার। আরমান কক্সবাজারে ট্রলারে বিস্ফোরণের ঘটনায় আহত জেলেদের একজন। ওয়ার্ডের ৫ নম্বর শয্যায় তার চিকিৎসা চলছিল। সকাল থেকে চরম অস্থিরতায় ভুগছিলেন তিনি। একপর্যায়ে ছটফট করতে করতে শয্যা থেকে গড়িয়ে নিচে পড়ে যান।

মিনিট পাঁচেক এ অবস্থা চলার পর স্ট্রেচার নিয়ে আসেন ওয়ার্ডবয়। এরপর ওই ওয়ার্ডবয় আর স্বজনরা ধরাধরি করে তাকে স্ট্রেচারে তোলেন। ওয়ার্ডবয় তাদের নির্দেশনা দেন নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) নিয়ে যেতে। পিছু পিছু যান তিনিও। এর মিনিট বিশেকের মধ্যে সেই স্ট্রেচারে করেই আরমানের মরদেহ নিয়ে ওয়ার্ডে ফিরে আসেন তারা। আইসিইউতে নেওয়ার পথেই আরমানের মৃত্যু হয়েছে। লাশ নিয়ে ফেরার পর পাশে ঘুরে ঘুরে বিলাপ করছিলেন সুইটি। বলছিলেন, ‘কতবার ডাকলাম, কেউ আসল না। কেউ কোনো কথা শোনে না। কোনো কথা বলে না।’

অবশ্য সুইটি আক্তারের এমন অভিযোগের বিষয়ে জানতে গেলে স্বজনদের বিরুদ্ধে উল্টো অভিযোগ দেন দায়িত্বরত একাধিক নার্স। তারা জানান, রোগীর স্বজনরা সবসময় অস্থিরতা দেখান। তাদের সেবা দিতে গেলেও অনেক সেবা তারা রিফিউজ করেন। পরে অস্বীকার করেন, নানা অনুযোগ করেন। আরমানকে স্যালাইন, ইনজেকশনসহ যা-ই দেওয়া হচ্ছিল, সে ও তার পরিবার সেগুলো নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে স্বজনদের বন্ডসইও নিয়েছেন তারা।

জানতে চাইলে ওয়ার্ডের সহকারী রেজিস্ট্রার রাশেদ উল করিম বলেন, ‘অতিরিক্ত রোগীর চাপ থাকায় সবার ওপরই একটা বাড়তি চাপ থাকে। এর মধ্যে স্বজন ও রোগীদের সামাল দেওয়া একটু কঠিন। অনেক সময় রোগীদের কাউন্সেলিং করার পরও তারা সহযোগিতা না করায় পরিস্থিতি অনুযায়ী বন্ডে সাইন নেওয়া হয়।’

চট্টগ্রাম ও আশপাশের ৯ জেলার প্রায় চার কোটি মানুষের অগ্নিদগ্ধ চিকিৎসার ঠিকানা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এই বার্ন ওয়ার্ড। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, ২৬ শয্যার এই ওয়ার্ডে প্রতিদিন রোগী ভর্তি থাকে ৫০-৬০ জন। রোগী আরও থাকলেও স্থানসংকুলান না হওয়ায় তাদের আউটডোর থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

চিকিৎসকরা বার্ন ইউনিটের তিন ধরনের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সুযোগ-সুবিধার অভাব। এই ওয়ার্ডে কোনো আইসিইউ, এইচডিইউ এবং আধুনিক অপারেশন থিয়েটার নেই। এমনকি দগ্ধদের ইসিজিসহ বিভিন্ন টেস্ট করার ব্যবস্থাও নেই। রোগীদের এগুলো করার জন্য বাইরে আনা-নেওয়াও কষ্টসাধ্য।

ওয়ার্ডের প্রধান চিকিৎসক রফিক উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘আইসিইউ ওয়ার্ডে শয্যা খালি থাকাসাপেক্ষে রোগী পাঠাতে পারি। কিন্তু এমন বার্নের আলাদা আইসিইউ, এইচডিইউ থাকা দরকার। আরমানের পর আরও দুজন রোগীকে পরপর আইসিইউতে পাঠানো হয়। যাদের সকাল থেকে আইসিইউর জন্য অপেক্ষমাণ রাখা হয়েছিল।’ শয্যা খালি হওয়ার পর আইসিইউ ওয়ার্ড থেকে জানানো হলে এই দুই রোগীকে আইসিইউতে পাঠানো হয় বলেও জানান তিনি।

দ্বিগুণের বেশি রোগী সেবা নিলেও ২৬ শয্যার জন্য যে লোকবল থাকার কথা, তা-ও নেই। ফলে রোগীর চাপ সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে সংশ্লিষ্টদের জন্য। রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনুমোদিত চিকিৎসকের সংখ্যা ৮ জন, কিন্তু আছে ৬ জন। নার্স আছে ১০ জন। যেখানে প্রতি তিনজনের জন্য একজন নার্স থাকা আবশ্যক। আর ক্রিটিক্যাল রোগীর জন্য একজন নার্স দরকার।’

পাশাপাশি তৃতীয় হলো স্থানের সংকট। প্রতিদিন আউটডোরে দেড় শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, ‘স্থানসংকুলান না হওয়ায় ভর্তির দরকার হলেও অনেককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’

তবে চীন সরকারের সহায়তার একটি বিশেষায়িত বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট স্থাপনের কাজ চলছে। এটি শেষ হলে এমন চিত্র বদলে যাবে জানিয়ে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. শামীম আহসান বলেন, ‘কাজটি শেষ হতে আরও বছর দুয়েক লাগবে।’ ততদিন পর্যন্ত সংকট সমাধান হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাস্তবতা আসলে ওই রকমই। তবে চেষ্টা করছি সামর্থ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ দিতে।’

Please Share This Post in Your Social Media


Comments are closed.

© 2019 Businessnewsbs24.com
Desing & Developed BY ThemesBazar.Com